ছবি: বিবিসি

গাজার কেন্দ্রীয় অংশে গৃহহীনদের আশ্রয়দাতা একটি স্কুলে এবং অন্য একটি বাড়িতে চালানো পৃথক দুইটি ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত ২৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। গাজার স্থানীয় চিকিৎসক ও সিভিল ডিফেন্স কর্মকর্তারা বরাত দিয়ে এমন তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম বিবিসি।

ছবি: বিবিসি

গাজা সিটির ফাহমি আল-জারগাওয়ি স্কুলে কয়েক শতাধিক গৃহচ্যুত মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন, যারা বেইত লাহিয়া শহর থেকে পালিয়ে এসেছিলেন—যেখানে ইসরায়েলি বাহিনী তীব্র হামলা চালাচ্ছে।

হামাস-নিয়ন্ত্রিত গাজার সিভিল ডিফেন্সের একজন মুখপাত্র জানান, স্কুল ভবন থেকে ২০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, যাদের অনেকেই শিশু এবং দগ্ধ অবস্থায় ছিলেন। আগুনে পুড়ে যাওয়া দুটি শ্রেণিকক্ষকে আশ্রয়কেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়েছিল।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী (IDF) দাবি করেছে, তারা “হামাস ও ইসলামিক জিহাদের একটি কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টার” লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।


তারা বলেছে, ওই এলাকা থেকে “ইসরায়েলি বেসামরিক নাগরিক ও সেনাদের বিরুদ্ধে হামলার পরিকল্পনা করা হচ্ছিল”, এবং হামাসকে “গাজার সাধারণ মানুষকে মানব ঢাল হিসেবে ব্যবহারের” অভিযোগও করেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা রামি রফিক, যিনি স্কুলটির ঠিক বিপরীতে থাকেন, ফোনে বিবিসিকে বলেন, “চারপাশে আগুন জ্বলছিল। পুড়ে যাওয়া মরদেহগুলো মাটিতে পড়ে ছিল। আমার ছেলে ভয়াবহ দৃশ্য দেখে অজ্ঞান হয়ে যায়।”

অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, আগুনে পুড়ে যাচ্ছে স্কুল ভবনের একাংশ, এবং শিশুসহ মারাত্মকভাবে দগ্ধ কিছু নিহতের দেহাবশেষ ও গুরুতর আহতদের করুণ অবস্থা।

স্থানীয় প্রতিবেদন বলছে, নিহতদের মধ্যে রয়েছেন গাজার উত্তরে হামাস পুলিশের তদন্ত প্রধান মোহাম্মদ আল-কাসিহ, তার স্ত্রী ও সন্তানরাও।

স্কুলে হামলার কিছুক্ষণ আগেই, গাজা সিটির কেন্দ্রীয় অংশে আরেকটি বাড়িতে চালানো ইসরায়েলি বিমান হামলায় আরও চারজন নিহত হন বলে জানিয়েছে হামাস-পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

এই দুটি হামলা গাজার উত্তরে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান সামরিক অভিযানের অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।

এর আগে শুক্রবার, গাজার এক চিকিৎসকের বাড়িতে চালানো এক হামলায় তার ১০ সন্তানের মধ্যে ৯ জন নিহত হয়। ডা. আলা আল-নাজ্জারের ১১ বছর বয়সী ছেলে আহত হয়েছে এবং তার স্বামী হামদি আল-নাজ্জার গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে রয়েছেন।

নিহত শিশুদের নাম—ইয়াহিয়া, রাকান, রাসলান, জিবরান, ঈভ, রাইভাল, সাইদেন, লুকমান ও সিদরা—তাদের বয়স কয়েক মাস থেকে শুরু করে ১২ বছরের মধ্যে।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ঘটনাটি পর্যালোচনার আওতায় রয়েছে।

এদিকে, শনিবার খান ইউনিসে রেড ক্রসের দুই কর্মী নিজ বাড়িতে এক হামলায় নিহত হন বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি।

নিহতরা হলেন অস্ত্র দূষণ কর্মকর্তা ইব্রাহিম ঈদ এবং রাফার রেড ক্রস ফিল্ড হাসপাতালের নিরাপত্তারক্ষী আহমদ আবু হিলাল। আইসিআরসি বলেছে, এই হত্যাকাণ্ড গাজায় বেসামরিক মৃত্যুর “অসহনীয়” মাত্রা তুলে ধরেছে এবং আবারও যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে।

রোববার, গাজায় বেসরকারিভাবে ত্রাণ বিতরণের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল অনুমোদিত বিতর্কিত এক সংস্থার প্রধান পদত্যাগ করেন।

গাজা হিউম্যানিটেরিয়ান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক জেক উড এক বিবৃতিতে জানান, গাজায় ত্রাণ বিতরণের জন্য স্থাপিত কেন্দ্রগুলো স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার মতো মানবিক নীতিমালার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হবে না—এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে।

ইসরায়েল গত ২ মার্চ গাজায় পূর্ণ অবরোধ আরোপ করে, যা টানা ১১ সপ্তাহ স্থায়ী ছিল। পরে আন্তর্জাতিক চাপ ও দুর্ভিক্ষের আশঙ্কায় সীমিত সহায়তা প্রবেশ করতে দেয়।
ইসরায়েলি সামরিক সংস্থা কোগাট জানিয়েছে, গত সোমবার থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত ৩৮৮টি ট্রাক গাজায় প্রবেশ করেছে।
তবে জাতিসংঘ বলছে, প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ ট্রাক সহায়তা দরকার গাজার পরিস্থিতি মোকাবেলায়।

অন্যদিকে, যুদ্ধ বন্ধে আলোচনার জন্য রবিবার মাদ্রিদে ২০টি দেশ ও সংস্থা এক বৈঠকে বসে। স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোসে ম্যানুয়েল আলবারেস বলেন, ইসরায়েল হামলা না থামালে তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা বিবেচনা করা উচিত।

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের সীমান্ত পার হয়ে চালানো হামলায় প্রায় ১,২০০ জন নিহত হয় এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়।

তার পর থেকে ইসরায়েল গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে, যাতে এখন পর্যন্ত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে অন্তত ৫৩,৯৩৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন—যাদের মধ্যে কমপক্ষে ১৬,৫০০ শিশু রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *